শনিবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

আত্মদ্রোহ


সকালের আকাশ খানিকটা মেঘলা আজ। শরৎকাল শুরু হয়েছে বটে তবে বর্ষাকালের রেশ এখনও কাটেনি। যেকোনো  সময় ঝপ করে নেমে যেতে পারে বৃষ্টি আবার উঠে যেতে পারে ঝলমলে রোদ। অফিসে ছাতাটা নিয়ে বের হবে কিনা ভাবছে কামরুল। ছাতা নিয়ে বের হলেও বিপদ আবার না নিলেও বিপদ। ছাতা নিয়ে বের হলে ফেলে আসার সম্ভাবনা আবার না নিয়ে বের হলে বৃষ্টিতে ভেজার সম্ভাবনা। এখন সাতটা বাজে। তার বাসা থেকে মাত্র দশ মিনিটের হাঁটার রাস্তা। তারপর কোনাবাড়ি থেকে অফিসের বাস। বাসে যেতে সময় লাগে বিশ মিনিট। বাসে যেতে সময়টা তার ভালই কাটে। যত সমস্যা এই দশ মিনিটের হাঁটার পথ নিয়েই। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বের হলেও শরীর তা কুলাতে পারে না। বয়স বেশি হয়নি তার। মাত্র ত্রিশ। একটি পুত্র সন্তানের জনক সে। পুত্রের বয়স মাত্র এক বছর। 

স্ত্রী তাকে পিরাপিড়ি করে ছাতা নিয়ে যাবার জন্য। স্ত্রীর মতে, ছাতা হারিয়ে গেলে আবার কেনা যায় কিন্তু হারিয়ে যাবার ভয়ে ছাতা ব্যবহার না করে শারীর খারাপে অর্থ ব্যয় সমীচীন না। কামরুলের কাছে অবশ্য আর্থিক বিষয়টা বিবেচনার বিষয় নয় অন্ততঃ ছাতার ক্ষেত্রে। তার কাছে ছাতা মানে একটা ঝঞ্ঝাট। তাই সে স্ত্রীর পিরাপিড়িতেও আজ ছাতা নিয়ে বের হলনা। অফিসে যাওয়া-আসার এই দশ মিনিটের পথটা ঝঞ্ঝাটের হলেও সে খুবই উপভোগ করে। অফিসে পৌছাতে তার সময় লাগে মাত্র ত্রিশ মিনিট। কিন্তু সে বের হয় এক ঘণ্টা আগে। দশ মিনিটের পথ হাঁটতে হাঁটতে সে উপভোগ করে মানুষের ছুটাছুটি। পিঁপড়ার দলের মত দল বেঁধে অফিসে যাবার ব্যস্ততা। কেউ ঘড়ির দিকে তাকাতে তাকাতে হোঁচট খাচ্ছে, সময় বাঁচাতে গিয়ে কেউ দৌড় হাটা হাঁটছে। মা তার ছোট্ট বাচ্চাকে নিয়ে স্কুলে রওনা হয়েছে। বাচ্চার কাঁধে স্কুল ব্যাগ যেটি  তার নিজের চেয়েও ভারী। চোখে তার ঘুম। ঘুমে হাঁটতে পারছেনা। মা তাকে টেনে টেনে নিয়ে দ্রুত চলছে; সময়ে পৌঁছতে হবে স্কুলে। দ্রুত ছুটছে বাস। খাদে জমে থাকা কাঁদা জলে ভিজিয়ে দিচ্ছে পথচারী।  যাত্রা ভঙ্গ তার। জ্যামে আটকে আছে রিক্সা, কেউ রিক্সাওয়ালাকে  গালাগাল দিচ্ছে, কেউ গালাগাল দিচ্ছে এমপিকে, কেউ মন্ত্রিকে, কেউ প্রধান মন্ত্রিকে, কেউ কেউ আবার ট্রাফিক পুলিশকে গালাগাল দিয়ে উদ্ধার করছে। কামরুলের ধারণা, এই সমস্ত গালাগাল যাদেরকে দেয় তারা যদি শুনত তবে তারা দেশ থেকে পালিয়ে বাঁচত। কামরুলের কেবলই মনে হয় আমরা কেমন করে নিজেদের দোষ অ্যনের উপর চাপিয়ে গালাগাল দিয়ে উদ্ধার করি! সমস্ত দোষ তো ঐ সময়ের। দেড়ি করে ঘর থেকে বের হই আর পথে পথে গালাগাল দিয়ে দেশ উদ্ধার করি। একটু সময় নিয়ে বের হলেই পারি!
  
দ্রুত পদব্রজে ছুটছে নারী-পুরুষ। পুরুষের তুলনায় নারীরাই বেশি। এই এলাকার বেশিরভাগ লোকই পোশাক শ্রমিক। কামরুল নিজেও পোশাক তৈরির কারখানায় চাকুরি করে। তবে অন্যদের মত অফিসে যাবার তার এত ব্যস্ততা নেই। কারণ সে অতিরিক্ত অন্ততঃ বিশ মিনিট সময় হাতে নিয়েই বের হয় প্রতিদিন। সময়ের হেরফের বিশেষ কোন কারণ ছাড়া একেবারে হয়না বললেই চলে। তার অফিসের বাস কোনাবাড়ি থেকে ঠিক সাড়ে সাতটায় ছেড়ে যায়। অন্য দিনের মত আজও সে কোনাবাড়ি পোঁছে গেছে সাতটা দশ মিনিটেই।
বাস ঠিক যে জায়গা থেকে ছেড়ে যায় তার অদুরেই এশা ড্রাগ হাউস। এইখানেই কামরুলের যাত্রা বিরতি। ছুটির দিন ব্যতিত সে অন্ততঃ দুই ঘণ্টা বিশ মিনিট এইখানে কাটায়। অফিসে যাবার সময় সকালের বিশ মিনিট আর ফিরে আসার সময় কমপক্ষে দুই ঘণ্টা এখানে কাটিয়ে সে ঘরে ফিরে। বেশ বড়সর ওষুধের দোকান। চারজন কর্মচারী। বাচ্চার আর তার মায়ের ওষুধ কিনতে কিনতেই কামরুলের সখ্যতা গড়ে ওঠে এই দোকানের মালিক আলী হায়দারের সাথে। অত্যন্ত শান্ত এবং সাদা মনের মানুষ এই আলী হায়দার । কামরুল তাকে শ্রদ্ধার সাথে ‘আলী ভাই’ বলেই ডাকে। আলী হায়দারের বয়স চল্লিশের কাছাকাছি হবে। সুঠাম দেহ আর মাথা ভর্তি চুল তার বয়সকে সঠিক পরিচয় দেয় না। চুল যদিও অনেকটাই সাদা হয়ে গেছে কিন্তু হেয়ার ডাই কখনওই তা প্রকাশ করতে দেয় না। তবে সখ্যতায় বয়স তাদের কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। আসলে সখ্যতা তাদের সমান্তরাল জীবনাদর্শে। শ্রদ্ধা আর সম্মানের মাখামাখি। দুজনেই কথা বলে কম, শোনে বেশি। দোকানের এক কোনে একটা চেয়ার পাতা থাকে। কামরুল সেখানে এসে বসে। আলী হায়দার বসে অপর কোণের আরেকটি চেয়ারে। কর্মচারীরাই প্রেস্ক্রিপশন দেখে আর সেই  মোতাবেক ওষুধ বিক্রি করে। কদাচিৎ আলী হায়দার প্রেস্ক্রিপশন দেখে আর দিন শেষের হিসাবটুকু করে। সারাদিন নিঃশব্দে মানুষের কথা শোনা আর তাদের ভাব ভঙ্গিমায় পথচলা দেখাই তার মোহ। একমাত্র কামরুলের সাথেই কিছু কথা বলে। অন্যদের সাথে হা না ছাড়া বিশেষ কথা বলে না।
অন্য দিনের মত আজও কুশল বিনিময় করে কামরুল বসে গেছে চেয়ারে। এই চেয়ারটা তার বিশেষ পছন্দ। চেয়ারের জন্য নয়, চেয়ারের অবস্থানের জন্য। পূর্ব পশ্চিমে বয়ে যাওয়া রাস্তার দক্ষিণধারের এই দোকানটির তিন ধারই খোলা। এই চেয়ার থেকে হাসপাতাল আর পুলিশ চৌকি একই সাথে দেখা যায়। দু জায়গায়ই বহু মানুষের আনাগোনা। হাসপাতালের করিডোর হাঁসি কান্নায় মিশ্রিত থাকে। তবে পুলিশ চৌকির করিডোর অবশ্য এমনটি নয়। এখানে মানুষ আসে মুখ ভার আবার যায়ও মুখ ভার করে। প্রতিদিনের এই বিচিত্র ঘটনা আর মানুষের মুখমণ্ডলে তাদের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখে দেখে কামরুল মোহাবিষ্ট। তেমনি মোহাবিষ্ট আলী হায়দার।
  
অন্য দিনের মত আজও কোনাবাড়ির ব্যস্ততা বেড়েই চলছে। এখনও ২০ মিনিট বাকী আছে কামরুলের অফিসের বাস ছাড়তে। হাসপাতাল থেকে চোখ ঘুরিয়ে পুলিশ চৌকির পাশ এড়িয়ে চোখ পড়ল চৌকির কিছুটা সামনে রাখা একটা সি এন জির দিকে। পাশে দাড়িয়ে আছে ট্রাফিক পুলিশ। ধামকা ধমকি করছে। কিন্তু এ দৃশ্যটা কিছুটা অন্যরকম। ট্রাফিক পুলিশ ড্রাইভারের সাথে ধামকা ধমকি করবে। কিন্তু এতো তা নয়! বাক বিতণ্ডার এক পর্যায়ে পুলিশ টেনে হিঁচড়ে বের করল একজন এক যাত্রীকে। লম্বা গরন, সুঠাম দেহী, মাথায় পাগড়ি পড়নে সাদা লুঙ্গি পাঞ্জাবি। মুখ ভর্তি দাড়ি গোঁফ। দাড়ি গোঁফে মুখখানা দেখা যাচ্ছে না। আপাত দৃষ্টিতে তাকে সুফি সাধক বলেই মনে হচ্ছে। তার হাত ধরে পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে তাদের পুলিশ চৌকির দিকে। সি এন জি ড্রাইভার বেড়িয়ে এসেছে। মনে বিরক্তের ছাপ। আলী হায়দারের ও চোখ এড়ালনা। সে তাকিয়ে আছে। কামরুল কৌতূহল নিয়ে দোকান থেকে বেড়িয়ে গেল। সি এন জির খানিকটা দূরে রাস্তার এক পাশে গিয়ে দাড়িয়ে পড়ল ঘটনাটি দেখার জন্য। ইতিমধ্যে সি এন জি থেকে বেড়িয়ে এসেছে আরও দুজন একই বয়সের সুফি সাধক। একজন আরেক জনের দিকে তাকিয়ে ড্রাইভারের দিকে ইশারা করে বলল- “জলদি টেকা বাইর কইরা অরে দেও”।
ইতিমধ্যে ড্রাইভার টাকার জন্য তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। সুফি সাধক তার সাদা পাঞ্জাবি খানিকটা উঁচু করে মাজায় গোজা টাকার বান্ডিল বের করল। একশ নোটের পাঁচশ টাকার বান্ডিল। এর মধ্য থেকে একটি পাঁচশ টাকার নোট ড্রাইভারকে দিল। ড্রাইভার টাকা নিয়ে এগিয়ে গেল পুলিশ চৌকির দিকে। কামরুলও তার পেছনে পেছনে পেছনে এগিয়ে গেল। ড্রাইভার কিছুদূর গিয়ে পেছনে ফিরে তাকাল। সামনে হাঁটতে হাঁটতে তার হাতের পাঁচশ টাকার নোট ডান পাশের প্যান্টের পকেটে রেখে বাম পাশের পকেটে থেকে একটি একশ টাকার নোট বের করে দ্রুত চলে গেল। কিছুদূর এগিয়ে কামরুল সি এন জির কাছে। সুফি সাধক দুজন এতক্ষণে সি এন জির ভেতরে ঢুঁকে বসে আছে। কামরুল সি এন জির দিকে খানিকটা ঝুকে তাদের কাছে জিজ্ঞেস করল- কি হয়েছে?
ভেতর থেকে এক সুফি সাধক উত্তর দিল- কিছু অয় নাই।
এর মধ্যে ড্রাইভার একা ফিরে এল। এসে সূফী সাধকদের বলল- হুজুর পাঁচশ টাহায় অবে না আরও পাঁচশ না দেলে ওনারে পুলিশ ছাড়বো না।  
এক জন সূফী সাধক ভেতর থেকে পাঁচশ টাকা বের করে দিল। কামরুল সি এন জি ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করল- কি হয়েছে?
ড্রাইভার বলল- কি আর কমু ভাই, পুলিশের চক্কর; পুলিশ কয় অ্যারা নাকি জে এম বি (জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ)। অ্যাগো এক জনরে পুলিশ ধরছে। অহন কয় হাজার টাহা না দিলে ছাড়বো না।
কথা বলতে বলতে ড্রাইভার এগিয়ে গেল। কামরুলের ধারণা- এরা কোন কুচক্রী দলেরই সদস্য কিংবা জেএমবি কিংবা কোন অপরাধের সাথে যুক্ত নইলেএরা নিশ্চয়ই প্রতিবাদ করত। তাছাড়া সাধক মানুষের কাছে এত টাকার বান্ডিল এভাবে থাকতে পারেনা। থাকলেও সৎপথে উপার্জিত কিংবা মহৎ কাজের টাকা দেশের বর্তমান অব্থায় লোকের সামনে এভাবে বের করে না।                       
কামরুল দাড়িয়ে আছে। ইতিমধ্যে আরো ৫-৭ জন লোক দাড়িয়ে গেছে। কারুলের মত এরাও একই ঘটনার দর্শক।                                            

এর মধ্যে একজন বলল- এরাই ভন্ড। কিরে সিএনজির ভিতরে কি  গাজা আছে নাকিরে... । ভেতর থেকে কোন উত্তর এলনা। সি এন জির ভিতরে বসা লোক দুজন কারো মুখের দিকে তাকাচ্ছে না শুধু সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। আরেকজন বলল-পুলিশ তো টাকা খাইয়া ছাইরা দিব হালাগো প্যাদানি দিলেই গরগর করে কইয়া দিব ওরা আসলে কারা। কেমন সুফীর ভেক ধরছে দেহেননা।   
                             
আস্তে আস্তে ভির বাড়ছে। ওদিকে এতক্ষণে কামরুলের অফিসের গাড়ি এসে দাড়িয়ে গেছে। এখনই তাকে ছুটতে হবে গাড়ির দিকে। কিন্তু মনে মনে সে চাচ্ছে এই সুফী রহস্য উন্মোচিত হোক। গাড়ি ছাড়ার আগে কামরুল দেখতে চায় হয় পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ড্রাইভার সহ বাকী দুজনকেও নিয়ে যায় আর তাদের সন্দেহের রহস্য উন্মোচন করে। কিন্তু না! তাতো হবার নয়, ড্রাইভার টাকা নিয়ে গেছে। টাকায় নিশ্চই সুফী রহস্য রহস্যই রয়ে যাবে।

কামরুলের ইচ্ছে করছে সে নিজেই এই রহস্য উন্মোচনে শরীক হয়। অপরাধী যদি এরা হয়েই থাকে তবে এরা আইনের সাজা পাক। এদের পুলিশে ধরিয়ে দেবে সে। এও দেখার বিষয় পুলিশ আসলে এই ঘটনায় কি ভুমিকা পালন করে শেষ পর্যন্ত। কিন্তু তার যে সময় নেই! কামরুলের গাড়ির ছেড়ে দেবার সময় হয়ে গেছে। সে গাড়ির দিকে যেতে থাকল। ইতি মধ্যে পেছনে ফিরে দেখে ড্রাইভার তার আটকে পরা যাত্রীকে(সুফী কিংবা সুফী বেশীকে) নিয়ে ফিরে এসেছে। এবং তড়িৎ গতিতে ড্রাইভার সমস্ত হট্টগোল এড়িয়ে সিএনজিতে তার তিন যাত্রীকে নিয়ে ছুটে চলে গেল। 
                  
রাগে দুঃখে ঘৃনায় এশা ড্রাগ হাউজের সামনে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল কামরুল । আলী হায়দার সাহেবের দিকে তার চোখা-চুখি হল। বলল-‘কোন দেশে বাস করি আলী ভাই।’ ইসমাইল সাহেব হতাশার হাসি দিয়ে বোঝালেন –‘যাচ্ছেতাই’। কামরুল এসে অফিসের গাড়িতে বসল। গাড়ি ছুটে চলল গন্তব্যে। ঠিক সময়ে পৌছে দিতে হবে সবাইকে। কামরুলের বাকরুদ্ধ।  জানলার দিয়ে তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। কিন্তু মনে হয় কিছু দেখছে না। একসময় বাসের আভ্যন্তরে শক্ত এক ধারে  সবার অলক্ষ্যে কিছুটা জোরে আঘাত করল। হাতে ব্যাথাও পেল। কিন্তু অনুভুত হল না। অবচেতন মনে ভাবছে আজকের ঘটনায় আসল অপরাধী কে? সে নিজে? এই তিনজন যাত্রী, সিএনজি ড্রাইভার? পুলিশ? সরকার? নাকি সিস্টেম? ভাবাবিস্ট অবচেতন মনের ভাবনায় তার অনুভুত হল না সে যে আঘাত করে ছিল কিছু আগে তাতে টিনের ধারে লেগে হাত কেটে  ঝড়ছে রক্ত...