মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০১৫

উৎসারিত অক্ষি


যাবার পথে আজ তাকে দেখতে পেলাম না। কেমন যেন একটা শূন্যতা মনে হচ্ছে। যেই জায়গাটাতে প্রতিদিন তার দেখা পাই সেখানে গিয়ে এদিক ওদিক করে তাকালাম না জায়গা বদল তো হয়নি। প্রতিদিন যাবার পথে কত কিছুই তো দেখি। রিক্সা আমাকে নিয়ে লক্কর ঝক্কর করে প্রতিদিনের দরগা গেইটের রাস্তায় টুং টুং করে বেল দিয়ে এগিয়ে যায় পথে রয়ে যায় কত ফকির, দোকান, দোকানী, সবজিওয়ালা একই জায়গায় একই ভাবে। আমি কি দেখি আর কি দেখিনা তার একটা মাপকাঠি পাওয়া গেল আজ। ইন্টারেস্টিং!
পারিবারিক সময়ের বাইরেরটুকুতে আমাকে মোহাবিষ্ট থাকতে হয় টেনিসন, পাবলো নেরুদা, হোয়াইটম্যান  কিংবা রবার্ট ফ্রস্টের কবিতার জগতে। এর মধ্যে অজান্তে সে কখন শিকড় গেরে বাসিন্দা হয়ে গেল? অবাক কাণ্ড!
ক্লাসে টেনিসনের Tears Idle Tears পাড়ানোর সময়ও সে ফিরে ফিরে আসছে। ভাবলাম ফেরার পথে নিশ্চয়য়ই তার দেখা পাব।
না! সে নেই!
বাসায় ফিরে দৈনন্দিন কাজের মাঝেও সে আমার অভ্যন্তরে তার উপস্থিতি জানান দিয়ে গেলপরদিন সকালে পুনরায় যাবার সময় না দেখে আমি রীতিমত উদ্বিগ্ন আর ফেরার সময়ও দেখতে না পেয়ে উদ্বিগ্নতার চরমসীমায় পৌঁছে গেলাম। কিন্তু হাস-ফাস করা ছাড়া আমার আর কি কিছু করার আছে?
এভাবে আরও একদিন কেটে গেল।
চতুর্থ দিনসমস্ত ভাবাভাবির অবসান ঘটিয়ে নেমে পলাম খুঁজতে। বিড়ম্বনা এড়াতে দরগা গেইটের গলিতে ঢোকার আগেই রিক্সা বিদায় করলাম। মনে হচ্ছে বাস্তবতায় আমি নেই কেবলই এগুচ্ছি লুনাটিকের পথেহবেই বা না কেন? আলফ্রেড লর্ড  টেনিসন দিয়েছেন আমার মাথাটি নষ্ট করে। তার কবিতার লাইনগুলো এখনো যে তাজা...
Tears from the depth of some divine despair
Rise in the heart, and gather to the eyes
ঠিকানা খোঁজার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ আমি দোকানীর সাহায্যই নেই। এবারও তাই করলাম কিন্তু প্রতি-উত্তর একইরকম হলোনা দোকানী আমার দিকে এক ঝলক রহস্য দৃষ্টি দিয়ে বলল-জানিনা। সামনে এগিয়ে গেলাম। পক্ষাঘাত গ্রস্থ এক শিশু সাহায্যের আহ্বান করল। আমি পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করব এমন সময় কি এক উৎকট গন্ধ নাকে ধাক্কা খেল। তার পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি ঘা পচন ধরেছে তারি গন্ধ। নাড়িভুঁড়ি ছিঁড়ে বমি বেরিয়ে যেতে চাইল। বমি চেপে দ্রুত এগিয়ে গেলাম। একটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি আর পরবর্তী পদক্ষেপের পরিকল্পনা করছি। লক্ষ্য করছি খানিকটা দূরে কয়েকজন ফকির আমাকে বিশেষ নজরে দেখছেআরও সামনে এগিয়ে গেলাম। সামনেই এক ফকির নিচু কাঠের খাটিয়ায় বসে আছে। পাশ কাটিয়ে যাবার সময় একবার চোখা- চোখী হয়ে গেল। স্থির শান্ত দুটি চোখ কালচে পাকা দাড়ি-গোঁফে মুখ দেখা যাচ্ছে না। তার চাহনিতে অন্য রকম আবেদন অনুভব করলাম। তার সামনে দাঁড়িয়ে গেলাম। পেছনের পকেট থেকে দশ টাকার একটি নোট বের করবো এমন সময় সে বলল- হের শইলডা বালা না। মাথায় আমার চক্কর দিয়ে গেল। আমি কি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম? হবে হয়ত। আমি পঞ্চাশ টাকার একটি নোট বের করে তার হাতে দিলাম। হাত খানিতে সাহায্যের আবেদন ছিল কিনা বোঝা গেলো না। কি এক আজানা রহস্যে তার দিকে আর তাকাতে ইচ্ছে হল না। একটা রিক্সা নিয়ে বাসায় ফিরে এলাম।
কেমন যেন এক স্বস্তি অনুভব করলাম। না সে হারিয়ে যায়নি।
জীবিকার তাগিদে সকালেই বের হতে হল একই সময়ে রিক্সায়। দরগা গেইটের বাঁকে এসে আমার চোখ দুটো আলোয় ভরে গেল। কি যে এক স্বস্তি! রিক্সা বিদায় করে দিলাম। মুঠোফোনে দেখলাম সময় বয়ে যাচ্ছে। তা যাক। আজ আর কোন পার্থিব বাঁধা নয়। এগিয়ে গেলাম। তাকে দেখতে পাচ্ছি প্রতিদিনের মত জীর্ণ- শীর্ণ শাড়ি পরিহিতা ষাটোর্ধ রোগাটে স্ত্রীলোক। খাঁদায় এগিয়ে দিচ্ছে মমতা মাখা খাবার তার ফকির-মিস্কিন ক্রেতাদের। নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ হলেও থালা হয়ত তাদের অর্থনীতির বাইরেই রয়ে গেছে।
আমি আরও এগিয়ে গেলাম পাঁচ-ছ জন ফকির খাচ্ছে। খাচ্ছে ক্ষুধায়। খাচ্ছে ক্ষুধার যন্ত্রণায়। কারো হাত আছে, পা নেই। কারো পা আছে হাত নেই। একজন অন্ধ সেও খাচ্ছে। মুখে লেগে যাচ্ছে খাবার আবার খানিকটা আবার গড়িয়ে পড়ছে নীচে। গত কালের সেই ছেলেটিও আছে। ভীরের সাথে। কিন্তু সে খাচ্ছেনা। তাকে পাশ কাটিয়ে গেলাম কিন্তু আজ আর সেই উৎকট গন্ধ আমার নাকে এখনো ধাক্কা দিলনা
এতদিন দূর থেকে বৃদ্ধাকে দেখেছি আর আপ্লুত হয়েছি করুণায় আর এখন কাছে এসেছি বাস্তবতায়ইচ্ছে হচ্ছে একটা খাঁদা চেয়ে আমিও বলি-আমার পাতেও কটা ভাত দাও। কিন্তু তা কি সম্ভব? খেয়াল করে দেখলাম গত কালকের সেই বৃদ্ধ ফকির এখানে নেই। আমি ফুটপাথ থেকে নেমে বৃদ্ধার সামনা সামনি গিয়ে বললাম- আপনার শরীর ভালো? ভুত দেখার মত সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি আবার বললাম- গত কায়েকদিন আপনাকে দেখিনি তো তাই। তার চোখ আদ্র হয়ে এল আর মুখে ফুটল স্নিগ্ধ হাসি। 

সিলেট, ১৮ই জুলাই ২০১৫ 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন