-পাউল কোয়েলহো
আমার প্রতিবেশী হাস্যোজ্জল মানুষ কিন্তু তিনি বললেন আমার গাছগুলির পাতা তার বাড়ির উপর পরছে তাই গাছগুলি আমার কেটে ফেলা উচিত। তার কথা শুনে আমি রীতিমত মর্মাহত। প্রকৃতির সংস্পর্শে জীবন যাপন করেছেন এমন একজন মানুষ, দশ বছরে বেড়ে ওঠা গাছগুলো কেটে ফেলতে বলতে পারেন শুধুমাত্র এর পাতা তার বাড়িতে পরে বলে?
একদিন আমি তাকে কফির নিমন্ত্রন করে বললাম- আমি গাছের পাতার দায়িত্ব নিলাম। এমন কি যদি আপনার বাড়ির ছাদ নষ্টও হয় আমি সেই ছাদ পরিবর্তন করে দেব। তিনি আমার প্রস্তাবে
সায় দিলেন না। পাল্টা বললেন আমি যেন
গাছগুলি কেটে ফেলি। আমি খানিকটা রাগ করে বলেই ফেললাম গাছ কাটার চেয়ে বরং আমি আপনার বাড়ীটাই
কিনে ফেলতে চাই।
তিনি জবাবে বললেন- ‘আমার বাড়ি বিক্রির জন্য নয়।‘
‘কিন্তু সেই টাকা দিয়ে আপনি শহরে একটি সুদৃশ্য বাড়ি কিনতে
পারবেন এবং সেই বাড়ীতে আপনি শীত-গ্রীষ্মে সস্ত্রীক আরামে থাকতে পারবেন।‘
‘আমার বাড়ি বিক্রির জন্য নয়। এখানে আমার আজন্ম বেড়ে ওঠা। তাছাড়া এই বৃদ্ধ বয়সে আমার পক্ষে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
তিনি আমাকে পরামর্শ করলেন- ‘প্রতিবেশী হিসেবে আমরা বিতর্কের পরিবর্তে শহরের একজন ভূমি বিশেষজ্ঞের পরামর্শে সিদ্ধান্ত নিতে পারি।‘
তিনি চলে গেলে বিশ্ব প্রকৃতির উপর তার অসম্মান আর অসংবেদী মনোভাব অনুভব করলাম। পরে ভাবতে লাগলাম – কেন
তিনি বাড়ি বিক্রিতে রাজী হলেন না? পুরো দিন ভেবে ভেবে বুঝতে পারলাম, তিনি তার জীবনের ধারাবাহিকতার একক গল্পে পরিবর্তন চান না। শহরে গিয়ে জীবন যাপন মানে একটা ভিন্ন জগৎ যার ভিন্ন মান আর সবচেয়ে বড় কথা, তার স্বকীয় পৃথিবী থেকে আলাদা। আর তিনি হয়ত মনে করেন এই বার্ধক্যে তিনি আর নতুন করে জীবন শুরু করতে পারবেন না। এটা কি আমার প্রতিবেশীর জন্য অদ্ভুত?
না। আমি মনে করি এটা
আমাদের সবার ক্ষেত্রেই ঘটে। কখনো কখনো আমাদের জীবন চলার পথের সাথে আমরা এতটাই
অভ্যস্ত হয়ে পরি যে, কোন সুবর্ণ সুযোগকেও প্রত্যাখ্যান করি। কেননা আমরা বুঝতে
পারি না যে সুযোগ কিভাবে কাজে লাগাতে হয়। আমার প্রতিবেশীর ক্ষেত্রে, তার বাড়ি এবং
গ্রামের সাথে তিনি এমন ভাবে একাত্ম হয়ে গেছেন যে বসবাসের ক্ষেত্রে
তিনি আর ঝুকি নিতে চান না। শহুরে মানুষের ক্ষেত্রে, তারা মনে করেন তাদের
প্রত্যেকের অবশ্যই ডিগ্রি থাকতে হবে, বিয়ে
করতে হবে, বাচ্চা হতে হতে হবে, বাচ্চাদেরও ডিগ্রি হতে হবে আর এভাবেই চলতে থাকবে। তাদের মধ্যে কেউ নিজেদেরকে জিজ্ঞেস করে না- ‘আমি কি ভিন্ন
কিছু হতে পারি?’
আমার মনে আছে- সেলুনের যিনি আমার চুল কাটেন তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করত যেন তার মেয়ে সমাজবিজ্ঞানের ডিগ্রি পেতে পারে। ডিগ্রি সে পেয়ে যায়। আর অনেক জায়গায় ঘুরে ঘুরে একটা সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে কেরানির চাকরিও
পেয়ে যায়। এখনো মেয়েটির বাবা আমায় মাঝে মাঝে গর্ব করে বলেন- ‘আমার মেয়ের ডিগ্রি আছে।‘
আমার অধিকাংশ বন্ধুদের এবং তাদের ছেলেমেয়েদের ডিগ্রি আছে। তার মানে এই না
যে তাদের পছন্দের পেশা তারা খুজে পেয়েছে। মোটেই না। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারস্থ হয়েছে কারণ, পুরাকালে যখন ডিগ্রির
প্রয়োজনীয়তা ছিল তখন কেউ একজন হয়ত বলে থাকবেন,
সমৃদ্ধ বিশ্ব গড়তে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির প্রয়োজন। এই সময় বিশ্ব ভালো উদ্যানকারি, খাদ্য উৎপাদনকারি, ভাস্কর,
খনিজ বিক্রেতা এবং লেখক থেকে বঞ্চিত ছিল। সম্ভবত ওই সময়টা ছিল এই সকল বিষয় পর্যালোচনা করার। চিকিৎসক,
প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী আর আইনজ্ঞ হতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয়। তাই বলে সবাইকেতো নয়?
এ বিষয়ে রবার্ট ফ্রষ্টের
কয়েকটি লাইন আমার মনে পড়ছে-
দুটি পথ বনভুমিতে এসে দুধারে বয়ে যায়, আর আমি-
আমি অপরিচিতের পথ নিলাম,
এবং যেই পথেই সমস্ত প্রভেদ।
যা হোক, আমার প্রতিবেশীর গল্পে ফিরে আসি- একদিন আমাকে অবাক করে তিনি শহর
থেকে ভূমি বিশেষজ্ঞ নিয়ে এলেন। বিশেষজ্ঞ আমাদের জানালেন- ফরাসি আইন অনুযায়ী প্রতিবেশীর জায়গা থেকে অন্ততঃ তিন মিটার দূরে গাছ লাগাতে হয়। আমার গাছগুলো মাত্র দুই
মিটার দুরত্বে লাগানো তাই ওগুলো কেটে ফেলতে হবে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন