(১)
ভারতের ব্যাঙ্গালুরুকে বলা হয় গার্ডেন সিটি। আর এই গার্ডেন সিটির প্রান এম
জি (মহাত্মা গান্ধী) রোড। আমরা আমাদের জয়নগর ফোর্থ ব্লককে বলে থাকি দক্ষিন
ব্যাঙ্গালুরুর এম জি রোড। এরই সন্নিকটে আমাদের কলেজ হোস্টেল ধনপাল মেমোরিয়াল।
যেখানে কেটেছে কলেজ জীবনের তিনটি বছর। হোস্টেল জীবনের প্রতিটি দিনের সাথে জড়িয়ে
আছে জয়নগর ফোর্থ ব্লককের স্মৃতি। বছর হয়ে গেল হোস্টেল ত্যাগ করেছি কিন্তু বিগত স্মৃতির
সাথে ফিরছি অহর-নিশি। সুযোগ পেলেই হোস্টেলে ঢু মারি। সিনিয়র জুনিয়র সবার সাথেই যোগাযোগের
এতটুকু ভাটা পরেনি। হোস্টেলের দিন শেষ হলেও প্রতীক, দ্বীপ, পৃথ্বী, রাজন আর আমি এই
পাঁচ জন রয়ে গেলাম যাদের সাথে সপ্তাহ অন্তে দেখা হতেই হবে। এই সপ্তাহ অন্তের দেখা আমাদের
মাঝে সাটারডে নাইট নামে পরিচিতি
পেয়ে গেল।
আমরা ব্যাঙ্গালুরু আছি অথচ সাটারডে নাইটে একে অপরের সাথে দেখা হয়নি এমনটি হয়নি। মিলনের স্থান আমাদের প্রিয় জয়নগর ফোর্থ ব্লক। এর
মিউনিসিপালিটি মার্কেটের পূর্ব দিকের মোটর সাইকেল পারকিং লটের দেয়াল খানিকটা চওড়া
আর উচু। এই উচু পাথুরে দেয়াল চমৎকার বসবার স্থান তৈরি করেছে। এই দেয়ালের বিশেষত্ত্ব
হলো এর উপরই প্রতিদিন বিকেলে বসে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের আড্ডা। তাদের গল্প গুজবে সরব হয়
এখানকার পরিবেশ। পরিচ্ছদের পরিপাটিতে বয়োঃজ্যেষ্ঠদের যখন এই পরিবেশে দেখি তখন
জীবনের সীমাবদ্ধতার কথা ভুলে যাই। মনে হয় জীবনের এ এক অন্য রূপ। এই রূপ মনে করিয়ে
দেয় সময়ের খেলা। আমরা শৈশব, কৈশর পার করে এসেছি। যৌবন ফুরিয়ে গেলেই আমাদেরও তাদের
অবস্থানে চলে আসতে হবে। এ এক কঠিন বাস্তবতা। মজার বিষয় হলো, তাদের গল্পে মুখরিত
হাস্যোজ্জ্বল মুখ দেখলে মনে হয় জীবনের এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই তারা জীবনকে কানায়
কানায় আনন্দে পূর্ন করেছে। আমাদের পাঁচ জনেরই আড্ডার জন্য এই জায়গাটা বিশেষ পছন্দ।
তবে আমাদের বসবার স্থান এরই অদূরে একটা অশথ গাছের সান বাধানো তলায়। যে যেখানেই
থাকি না কেন শনিবার বিকেল পাঁচটায় মিলিত হবই। এর পর ঘন্টা দুয়েক অর্থহীন আড্ডা।
ঘন্টা খানেক ঘোরা-ফেরা। এর পর পালা ক্রমে আমাদের কারো রুমে গিয়ে বিয়ার পানে তাস
খেলা। এটাই আমাদের প্রতি সপ্তাহের কাঙ্খিত অতি মূল্যবান সাটারডে নাইট।
আমাদের পাঁচ জন বন্ধুর মাঝে আমি আর
রাজন বাংলাদেশী। আর বাকি ওরা তিনজন পশ্চিম বাংলার। প্রতীক, পৃথ্বী আর আমি
কম্পিউটার বিজ্ঞানে, রাজন বিবিএ, দ্বীপ মাইক্রোবায়োলজিতে স্নাতক সেরে চাকুরির সাথে
সাথে স্নাতকোত্তর পড়ছি। আমাদের এই ছোট্ট কমিউনিটিতে প্রত্যেকের চরিত্র প্রত্যেকের
চেয়ে আলাদা। তবুও আমাদের কোন মিল আমাদের একত্রিত করে মাঝে মাঝে আমার দুর্বোধ্য মনে
হয়।
(২)
আজ শনিবার। গত দু’দিন ধরে আমার শরীরটা কিছুটা খারাপ যাচ্ছে। কিছুটা জ্বর
জ্বর অনুভব করছি। ভেবেছিলাম আজ বুঝি আড্ডায় যোগ দেয়া হয় না। রাজন আমার রুমমেট। ওর
পিরাপিরিতে ওর বাইকের পিছনে চড়ে চলে এলাম আমাদের প্রিয় জায়গাটিতে। এসে দেখি বাকীরা
উপস্থিত। সবার সাথে করমর্দন করে আমাদের নির্ধারিত অশথ গাছের সান বাধানো তলায়
বসলাম। এতক্ষণে আড্ডা পুর জমে গেছে। চলছে তর্ক যুদ্ধ। বিষয় আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে
ভারতীয় উপমহাদেশে প্রভাব। মজার ব্যাপার হল আমরা কোনদিন কোন বিষয়ে সবাই একমত হতে
পারিনি। যে যার মতামতে অটুট থেকেছি। জয়নগর ফোর্থ ব্লকের তর্কযুদ্ধ কোনদিন উপসংহার
পায়নি। তবে প্রত্যেকের মতামত যুক্তি এবং তথ্য নির্ভর। না হলে, তর্কে বোল্ড আউট। আজকের
তর্ক জমে উঠেছে। আমি বসতে যাব এমন সময় হঠাৎ
আমার মুঠোফোন প্যান্টের পকেটে বেজে উঠল। বের করে দেখি আসিফের ফোন।
-হ্যালো, রন, তুই কি বাসায়?
-না রে আসিফ আমি ফোর্থ ব্লকে।
-ফিরতে দেড়ি হবে?
-হ্যাঁ, কিছুটা। কেন বলতো?
- তোর বাইকটা প্রয়োজন ছিল। তোকে সেদিন যে টিটুর কথা বলেছিলাম ও অ্যাকসিডেন্ট
করেছে। অবস্থা খুব খারাপ।
- বলিস কি?
-হ্যাঁ রে... আজ ভোরে।
- কোথায়? কিভাবে?
- ওরা আট বন্ধু মিলে বাইকে করে মহীশুর থেকে ফিরছিল। পথে ট্রাকের সাথে টিটুর
বাইক ধাক্কা লাগে। টিটু নাকি বাইক চালাচ্ছিল পেছনে ছিল তমাল। দুজনের অবস্থাই
খারাপ। ওখানের লোকাল হসপিটাল ওদের ফেরত দিয়েছে। এম্বুলেন্সে করে এ্যাপোলো হসপিটালে
আনা হচ্ছে। আমি এই পর্যন্তই জানি।
- ওরা হসপিটালে পৌঁছেছে?
-এখনো পৌঁছায়নি তবে কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে যাবে।
- আমি বাইক নিয়ে চলে আসছি ওয়েট কর।
- না রে দরকার নেই। লেট হয়ে যাবে। আমি ম্যানেজ করে নেব। পারলে একবার এ্যাপোলোতে
আসিস। টিটুর বাবা আর তামালের ভাই আসছে এয়ারপোর্টে। ওখান থেকে আবার এয়ারপোর্ট যেতে
হবে।
- এখন রাখি। বাই।
- হ্যাঁ, অবশ্যই আসছি। ওকে বাই।
ফোন রেখে দিয়ে আমি যেন নিথর হয়ে গেলাম।
(৩)
টিটুর সাথে আগামিকাল রবিবার আমার দেখা করার কথা ছিল। এমনি তাকে আমি চিনি না।
কোনদিন দেখাও হয়েছে কিনা মনে পড়ছেনা। গত রবিবার আমার ছুটির দিনে আসিফের সাথে আমার
কথা হয়। আসিফ আমাদের কম্পিউটার বিজ্ঞানের সহপাঠী। স্নাতক সেরে ও এখন বাংলাদেশে
টেকভ্যালি নামক কোম্পানিতে চাকরি করে। গত সপ্তাহে ও ব্যাঙ্গালুরু এসেছে একাডেমীক
কাগজপত্র তুলতে দু’সপ্তাহের ছুটি নিয়ে। ও আমাদের মত হোস্টেলে থাকেনি। আমাদের কলেজে
যারা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে পড়তে আসে তারা বরাবরই কনকপুরা রোডের পাশে ৩৬ নম্বর
বাড়ির তিনতলার একটি ফ্লাটেই থাকে এবং একই ধারা এখনও বর্তমান। তাই ওদের ফ্লাটটি
চিটাগাং ফ্লাট নামেই আমাদের কাছে পরিচিত। ও ওখানেই উঠেছে ওর উত্তরসুরিদের সাথে।
রবিবারে ওর সাথে দেশের নানা খবরাখবর, ক্যারিয়ার প্লান সহ নানান বিষয়ে বিষয়ে কথা
হয়। এর মাঝে কি প্রসঙ্গে যেন টিটুর কথা বলে আমাকে। আমার উৎসুকতায় আমাকে টিটুর অবসেসনের
কথাও জানায়। টিটু আমাদের জুনিয়র। আমাদের কলেজেই বি সি এ (বাচেলর অব কম্পিউটার
অ্যাপ্লিকেশান) সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র। ও তুলি নামের একটা হিন্দু মেয়েকে ভালবাসত।
এক পর্যায়ে মেয়েটিকে নিয়ে পালিয়ে যাবারও সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু কি এক অজ্ঞেয় কারনে
নিজের আন্তরিকতার কাছে হার মানে। তুলি রাজী না হলেও তাকে পাত্রস্থ করে ফিরে আসে
টিটু আসিফের সাথে। অজ্ঞেয় কারনটি আবিষ্কারের নেশা আমাকে পেয়ে বসে। আমি আসিফের কাছে
টিটুর সাথে দেখা করার প্রস্তাব করি। গত শুক্রবারে অনুসন্ধিৎসু মনে আসিফকে কল করি
টিটুর সাথে দেখা করা যাবে কিনা। আসিফ জানায় টিটুর সাথে সে কথা বলেছে এবং রবিবার
সন্ধ্যায় আমাকে চায়ের নিমন্ত্রন জানিয়েছে তাদের চিটাগাং ফ্লাটে।
আমার ফোনালাপে আমাদের আড্ডার তর্কযুদ্ধ উধাও। প্রতীক নিরবতা ভঙ্গ করে বলল-
তোদের চিটাগাং ফ্লাটে হল কি রে? একের পর এক দুর্ঘটনা। কিছু দিন আগে রোড
অ্যাকসিডেন্টে ফরহাদের হাত ভাঙ্গল তার আগে তোদের এক বড় ভাই কি যেন নাম শরিফ ভাই পা
ভাঙ্গল এর পর পরই এই ঘটনা। কিছু গোলমাল আছে ভাই ও ফ্লাটে।
পৃথ্বী সাথে সাথে বলল- ওদের ফ্লাটে একবার গিয়ে আমার যেন কেমন কেমন মনে
হয়েছে।
আজকের আড্ডা আর জমল না।
পালাক্রমে আজকের সাটারডে নাইটের হোস্ট আমি আর রাজন। আমরা সাকাম্বারি নগরে
থাকি।
আমাদের কোন কাজের লোক নেই। আমি আর রাজন নিজেরা রান্না করেই খাই। আজকের
সাটারডে নাইটের আয়োজনে আমরা মিউনিছিপালিটি মার্কেট থেকে ১টা ফুল গ্রিল চিকেন, ১০
টি নান, ২ টি পালক পনির, ৫ টি কিংফিসার বিয়ার আর ১ প্যাকেট মিক্সার (চানাচুর) নিয়ে
৮ টার দিকে রুমে ফিরলাম।
ওদের রুমে রেখে আমি বাইক নিয়ে ছুটলাম আসিফদের ফ্লাটে। সাকাম্বারি নগরে
আমাদের ফ্লাট থেকে মাত্র দু’ কিলোমিটার দূরে চিটাগাং ফ্লাট। মোটরসাইকেল থাকায় দু’কিলোমিটার
কোন দূরত্বই নয়। কিন্তু ওখানে গিয়ে দেখলাম তিন তলার ফ্লাট একেবারেই শুণ্য। আসিফ
ব্যস্ত ভেবে ফোন করা থেকে বিরত থাকলাম। চলে গেলাম এ্যাপোলো হাসপাতালে। সহজেই
আসিফকে পেয়ে গেলাম লবিতে। আরও দেখলাম মাথায় আকাশ ভাঙ্গা এক পিতা আরেক ভাই। তাদের চোখের জল
অভ্যন্তরে আটকে আছে কালো মেঘের মত। কখন যে ঝরবে বোঝা মুশকিল। আসিফকে জিজ্ঞেস করলাম
কোন কিছুর প্রয়োজন কিনা। ও বলল ওদের অভিভাবকরা এসেছেন। আপাতত কিছুর দরকার নেই। দুজনকেই
রক্তও দেওয়া হয়েছে পর্যাপ্ত। ওদের বন্ধুরা দিয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম -ওরা কে
কোথায় এখন?
-টিটু আই সি ইউ তে আর তমাল অপারেশান থিয়েটারে। টিটুর অবস্থাই বেশি খারাপ।
তমালের শুধু ডান পাটা ভেঙ্গে গেছে।
-টিটুর কি সেন্স আছে?
-না রে।
আসিফের সাথে কিছুক্ষণ ওদের বিষয়ে কথা বলার পর ওকে বললাম- ওকে আসিফ, আমার
রুমে মেহমান আছে। ফিরতে হবে। কোন প্রয়োজন পরলে বলিস।
এবার ওর কাঁধে হাত দিয়ে বললাম- অ্যানি টাইম।
ও আমার করমর্দন করে বলল- ঠিক আছে দোস্ত। আমি জানি।
ইচ্ছা হল টিটুকে একবার দেখে আসি। কিন্তু ও যে আই সি ইউ তে! মনটা এক বিশাল
বিষণ্ণতায় পূর্ণ হল। একটি অচেনা ছেলে আমার মাঝে বড় দাগ কেটে দিচ্ছে। মনে মনে
বললাম- যোদ্ধার মত লরে যাও আমার
প্রার্থনা তোমার সাথে আছে। সুস্থ হলে তোমার সাথে অনেক কথা আছে।
(৪)
বাসায় ফিরলাম। কিছুই ভাললাগছে না। ফিরে দেখি তাস খেলা শুরু হয়েছে। টুয়েনটি
নাইন। সাথে চলছে বিয়ার আর মিক্সার। আমি তাস খেলা আর বিয়ার পান থেকে বিরত থাকলাম।
ওরাও জোরাজুরি করলনা। ওরা খেলায় মত্ত। আমি একটা নান আর কিছু পালক পনির খেয়ে শুয়ে
পরলাম।
রাত তখন বারটা। ওদের চেচামেচিতে ঘুম ভাংল। পাঁচ বোতল বিয়ার শেষ! খাবার
দাবার যা ছিল সব শেষ। এক এক বোতলেই ওরা টালমাটাল। তবুও ওদের আরও চাই। দুটো বাইকে
করে চার জন বের হল। আমি ওদের বের হতে বারন করলাম কিন্তু কে শোনে কার কথা। এটাই হয়ত
তারুন্ন্যের অশুভ ছেলেমানুষি। কি জানি, হয়ত এরই অকারণ বলি আমাদের টিটু।
ওরা বের হয়ে গেলে আমার ভাবনা বাড়তে লাগল। ব্যাঙ্গালুরু প্রশাসনিক দিক দিয়ে অনেক নিরাপদ শহর। রাতে শহরের অলিতে গলিতে ঘুরে
বেড়ায় হয়সালা নামক এক টহল গ্রুপ। রাতে সন্দেহভাজন কাউকে গ্রেপ্তার করলে তার আর
জামিন হয়না। সরাসরি কোর্টে। এদের সাথে কোন লোকালাইডের সুপারিশও চলেনা তার উপর আমরা
বাঙালি আর বাংলাদেশী এবং মদ্যপ অবস্থায়। প্রায় ৩০ মিনিট পর প্রতীক আর দ্বীপ ফিরে
এল। আমি ভাবছিলাম ওরা সবাই ফিরে এসেছে কিন্তু রাজন আর পৃথ্বী ফিরলনা।
ওরা চারজনে গিয়েছিল কনকপুরা রোডে কিন্তু কোথাও হুইস্কি না পেয়ে প্রতীক আর
দ্বীপ ফিরে এসেছে কিন্তু রাজন আর পৃথ্বী সিটি মার্কেট গেছে। সিটি মার্কেটের কোথায়
যেন ২৪ ঘণ্টার একটা শপিং মল আছে সেখানে নাকি হুইস্কি পাওয়া যায়।
সাড়ে বারটা বেজে গেল। ওরা ফিরলনা। প্রতীক আমি আর দ্বীপ ভাবনায় পরে গেলাম।
রাজন একটু উল্লাস প্রিয়। অনেক স্পীডে বাইক চালায়। তার কিছু কিছু উদ্ঘট ছেলেমানুষি
কাণ্ডের কথা মনে পরায় আমরা আরও ভাবনায় পরে গেলাম। দ্বীপ বেচারার ভাবনা আর বেড়ে গেল
কারণ ওর অনেক সখের নতুন ইয়ামাহা ওয়াই বিএক্স
বাইক নিয়ে গেছে রাজন। আমরা কামনা করছি ভালোয় ভালোয় ফিরে আসুক ওরা।
(৫)
প্রসঙ্গত আমাদের মনে পরে গেল গত বছর থারটি ফাস্ট নাইটের কথা। আমরা পাঁচ
বন্ধু মিলে গিয়েছিলাম এম জি রোডে। অধিকাংশ ব্যাঙ্গালোরবাসী এই এম জি রোডে একত্রিত
হয়ে থারটি ফাস্ট নাইট উৎযাপন করে অর্থাৎ ইংরেজি বর্ষ বরন করে। অনেক ভালো লাগে ১২
টা বাজার সাথে সাথে গাগন বিদারী শব্দে আর আতশ বাজির রঙে রাঙ্গানো আকাশ আবার তারই
আলোতে চেনা-অচেনা মানুষের আলিঙ্গন। সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে সবাই একাত্ম হয়ে যায়
পুরনোকে ফেলে আগামি দিনগুলির শুভকামনায়। আমাদের দেশেও সাম্যের এই দৃশ্য একবার দেখেছিলাম
আই সি সি ট্রফিতে বাংলাদেশের বিজয়ের দিন। যা হোক, আমরাও পাঁচ বন্ধু এসেছিলাম পুরনো
বছরের এক ঘণ্টা আর নতুন বছরের এক ঘণ্টা
আনন্দ উপভোগ করতে। আমরা চিন্নাসামি
শ্টেডিয়ামের দিক থেকে ফুট পাথ থেকে পায়ে হেঁটে হেঁটে ব্রিগেড রোডের দিকে আসছিলাম।
আমাদের মৌন উল্লাস রাজনকে বিরক্তি ধরিয়ে দিচ্ছিল। ও গায়ের টিশার্ট খুলে মাজায় গেরো
দিয়ে রাস্তার মাঝখানে চলে গেল। আশেপাশের শপিং কমপ্লেক্সের লাউড স্পিকারের গানের
তালে তালে ঝুলে ঝুলে মৃদু নাচে হাঁটা আরম্ভ করল। আমিও মনে মনে ভাবলাম ওর উল্লাসকে
চেপে রেখে লাভ কি? করুকনা উল্লাস ওর মত। প্রতীক রাজনকে বলল- পেছনে পুলিশের গাড়ি। রাস্তার
সাইডে চলে আয়। পুলিশ জনসমাগম কন্ট্রোল করছিল যাতে যান চলাচলে কোন বিঘ্ন না ঘটে।
প্রতীকের ডাকে কোন সারা দিল না রাজন। বরং আমাদেরও ডাকছে রাস্তার মাঝে আসার জন্য।
আমিও তাকে ডাকলাম। ও বলল- You coward! You people dare to express
your own happiness. দুবাহু
দুদিকে প্রসারিত করে আরও উচ্চ স্বরে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল- Let the cop comes… I will express my happiness like a hurricane.. কথা শেষ না হতেই পুলিশের
বেত্রাঘাত ওর পিঠে। পুলিশ ওকে পেছন থেকে সরে যেতে বলেছিল কিন্তু ও শুনতে পায়নি।
পুলিশের সাথে ওর কি কথা হল জানিনা আরও দু ঘা পরল পিঠে। তারপর মাজায় গেরো দেওয়া
টিশার্ট গায়ে দিয়ে আমাদের সহযাত্রী হল। প্রতীক বলে উঠল- Again you’ve dare to express your happiness like a hurricane..? রাজন হাসিমুখে বলল- আনন্দ
পেতে হলে আনন্দের ছন্দপতনকেও সহজভাবে মেনে নিতে হয়। কথাটা আমার না জন হেইডের।
খারাপ লাগলেও আমরা বেশ মজা পেলাম। জন হেইডের কথা মনে করে রাজন সান্ত্বনা পেলেও এক
সপ্তাহ ব্যাথার ওষুধ খেতে হল। পুলিশের বেত্রাঘাত বলে কথা!
(৬)
বাইকের শব্দে আমরা সবাই আশ্বস্ত হলাম ওরা ফিরেছে। রাত একটা বেজে গেছে। আমি
যেহেতু আজ ওদের সাথে মদ্য পানের সাথী হবনা তাই আমাকেই ওদের জন্য পেগ তৈরি করতে হল।
আবার শুরু হল তাস খেলা। টিউব লাইট বন্ধ করে জ্বালানো হল স্লিপিং লাইট। কম্পিউটারে
চলছে মাইলড ভলিউমে চলছে Scorpion- এর Still loving
you… ব্যাঙ্গালোরের
ভোরের শীতল বাতাস বইতে শুরু করেছে। আমি দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছি আর ওদের
অর্থহীন, লাগামহীন কথাগুলি শুনছি। যে যেভাবে পারছে বকবক করেই যাচ্ছে। আমি মজা
পাবার চেষ্টা করেও পারছিনা। আমার টিটুর কথা মনে পরছে। আমার এখন মনে হচ্ছে এক
বিন্দু আনন্দ/উল্লাস থেকে উৎপন্ন দুটো বিপরীতমুখী চলমান বিন্দু যার একটির পরিনতি
আশঙ্কাজনক আরেকটি এখনও আনন্দময়। হটাৎ ঘন শীতল
বাতাসে জানালার পর্দা এক কোনে চলে গেল। আমাদের জানালাটার পুরটাই খোলা যায়। বাড়ির সিঁড়ি পথ এততাই সরু যে আমরা আমাদের আসবাবপত্র সব
রশি বেঁধে এই জানালা থেকে তুলেছি। জানালা খুললেই পূর্ব দিকে উত্তর দক্ষিণ মুখী রাস্তা।
জানালা খোলাই ছিল। আমি জানালার দিকেই তাকিয়ে আছি। অল্প আলোতে মনে হল মুখাবৃত মনুষ্যাকৃতি কেউ জানালার কাছে
এসেছে। আমি তড়িৎ
গতিতে ভাল করে দেখার চেষ্টা করলাম। না তেমন কিছু নজরে এলো না। ভাবছি এসব আমার hallucination. গায়ে
হাত দিয়ে দেখি জ্বরটা খানিকটা বেড়েছে। থার্মোমিটারে পরীক্ষা করার জন্য উঠতে গেলেই ‘চট’
করে শব্দ হল। এই শব্দে আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে মুহূর্তেই ধড়মড় করে উঠে গেলাম। প্রতীক আমার দিকে মুখ করে বসেছিল। পায়ের গিঁটের ‘চট’
শব্দে আমার হরিণ লাফ ওর চোখ এড়ালনা। ও হেসেই খুন। ওর বর্ণনায় বাকী সব বন্ধুরাও এক
পশলা বিনোদন আদায় করে নিল। আমার রুম ত্যাগ করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিলনা। অ্যানালগ থার্মোমিটার
মুখে পুরে দেখলাম তাপমাত্রা ১০২.৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট। একটি Ibuclin JR ট্যাবলেট খেয়ে শুয়ে পরলাম।
ঘুম আর আসতে চাইলনা। কেবলই মনে হতে লাগল টিটুর কথা। কি এক অদ্ভুত কারনে এই
অপরিচিত ছেলেটি আমার এত কাছে চলে এসেছে। তার নিজের আন্তরিকতার কাছে পারাজিত হবার
অজ্ঞেয় কারণগুলো কি কি হতে পারে ভেবে আমার ভাবনাগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তার
আজকের এই পরিনতির জন্য তার আন্তরিকতার মনস্তাত্ত্বিক চাপ দায়ী হয়ে থাকলে এর
দায়িত্ব কে নেবে? সে নিজে? তার প্রেয়সী? উভয়ের পরিবার? নাকি আমাদের সমাজ? না আমি
আর ভাবতে পারছি না। উঠে পরলাম। ঘড়িতে দেখলাম রাত ১ টা ৫৫ মিনিট। আস্তে আস্তে
জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। জানালা দিয়ে যা কিছু দেখা যায় সব ঠিকই আছে। শুধু একটি
প্রান বেঁচে থাকার লক্ষ্যে এই মুহূর্তে লড়ে যাচ্ছে আমাদের সবার অলক্ষ্যে।
বন্ধুরা সবাই আমাকে একবার দেখে আবার খেলায় মনোযোগ করল। আমি ওদের দিকে একবার
তাকিয়ে পুনরায় জানালার দিকে তাকাতেই জানালার বাইরে থেকে একটা হাত ভেতরে আসতে
দেখলাম। ভিখারির মত কেউ বলল- ভুক লাগি হে বাবু, খানে কে লিয়ে কুছ দে না... ।
জানালার বাইরে থেকে হাত ভেতরে এসেছে! আর কোথায় দাঁড়াল সে? আমাদের ফ্লাট তো তিন তলায়!
আমি ঘোরপাক খেতে লাগলাম। খানিকটা এগিয়ে সাদা কাপড়ের মত মুখাবয়ব দেখতে পেলাম। আরো
ভাল করে তার মুখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করলাম। ক্ষীণ আলতে তার মুখ দেখা গেলনা।
শুধু দেখলাম অতি শান্ত স্থির দুটি চোখ। বিড়বিড় করে আমায় কি যেন বলে গেল। আমি তার
দৃষ্টি সহ্য করতে পারলাম না। সঙ্গা হাড়িয়ে ফেললাম।
(৭)
যখন চোখ খুললাম বাইরে তখন ঝলমলে রোদ। আমার বিছানার পাশে প্রতীক, দ্বীপ,
রাজন আর পৃথ্বী সবাই উৎসুক পলকে আমার দিকে চেয়ে আছে। সবার মধ্যে একটা ভীতি। বুঝলাম
ঘুম হয়নি কারও। সবাই একসাথে প্রশ্ন করে বসল কি হয়েছে আমার? বললাম- আমার কি কিছু
হয়েছিল?
পৃথ্বী বলল- না কিছু হয়নি। আমরা
সারা রাত বোকার মত তোর কাণ্ড দেখছিলাম।
দ্বীপ বলল- শালা! আমাদের তো মার্ডার কেসের আসামি বানিয়ে দিচ্ছিলি রে! যা
কাণ্ড দেখালি রে আজ। মরার পরেও মনে থাকবে।
-কি করলাম?
রাজন সবার জন্য চা নিয়ে ঢুকল। বলল- তোর জন্য না। তোর শাস্তি তুই বানিয়ে
খাবি। আমি হাসলাম। বুঝলাম ওদের উপর দিয়ে চিন্তার ঝড় বয়ে গেছে। প্রতীক আমার হাতে চা
দিয়ে রাত্রের ঘটনা বর্ণনা করল- আমি নাকি হঠাৎ করেই কাপুনি দিয়ে দেওয়ালে হেলান
দেওয়া অবস্থা থেকে মেঝে পরে গেলাম আর বিড়বিড় করে বলতে লাগলাম- ও কে কিছু দিস না।
কিছু দিস না। প্লিজ... কিছু দিস না। এইসব। এরপর কথা বন্ধ হয়ে গেল। প্রচণ্ড তাপ
বেড়ে গেল। দাতে দাত লেগে গেল আমার। সংজ্ঞা ফিরিয়ে আনার অনেক চেষ্টা হল। অনন্যোপায়ে
হাসপাতালে নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত হল। কিন্তু সম্ভব হল না। কারণ একেকজন হুস্কিতে এতই
চুর যে নিজেরাই দাঁড়াতে পারছে না। এরই মধ্যে পৃথ্বী বমি করেছে। বাকি তিনজন আমার
চোখে মুখে জল-তেল দিয়ে যথা সাধ্য চেষ্টা করেছে আমার সংজ্ঞা ফিরিয়ে আনতে। আমার
গায়ের জ্বর বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। তাই ওদের আশা ছিল তারাতারি সংজ্ঞা ফিরে আসবে।
ওরা চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগল আর এই চেষ্টা করতে করতে এই আমার চোখ খুলল।
রাজন আমাকে জিজ্ঞেস করল- সত্যি কথা বলতো তোর আসলে কি হয়েছিল?
আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম- কাল রাতে ভিখারি এসেছিল- ভুক লাগি হে বাবু, খানে
কে লিয়ে কুছ দে না... বলছিল মনে আছে?
সবাই বলল- হ্যাঁ।
ঠিক মনে আছে তো?
হ্যাঁ।
একবারও কি তোরা ভেবেছিস এটা কি সম্ভব? বাঙ্গালুরুতে কি ভিখারি আছে?
-আছে, তবে রেয়ার।
আচ্ছা।
আমরা থাকি তিন তলায়। ফ্লাটে ঢোকার একমাত্র পথ হচ্ছে সিঁড়ি, যেটি ফেরার সময় তোরা
তালাবদ্ধ করে এসেছিস আর রুমে ঢুঁকে ভেতর থেকে হুক লাগিয়ে দিলি।
ঠিক?
তাহলে তিনতলায় ভিখারি আসবে কিভাবে? তোরা সবাই অনুভব করলি কেউ এসেছে। কিন্তু
কেউ কি দেখেছিলি?
সবাই চুপ।
তোরা দেখিসনি কারণ তোরা দেখার মত অবস্থানে ছিলিনা। দেখার মত অবস্থায় ছিলাম
আমি। আর তাই আমার এই হাল।
দ্বীপ বলল- গরবর ভাই। বরা গরবর।
রাজন বলল- ফুলিশনেস। কই আমরতো মনে পড়ছে না কোন ভিখারি ফিখারি। দেখলাম তুই
কাঁপতে কাঁপতে ফ্লোরে পরে গেলি।
পৃথ্বী বলল- প্লিজ বলিস না ভুত দেখেছিস।
প্রতীক কিছু বলল না।
আমার ফোনটা বেজে উঠল। আসিফের ফোন। বলল- দোস্ত, টিটু কে বাঁচানো যায়নি। ও
রাত দুই টার দিকে মারা গেছে।
ফোন রেখে দিয়ে আমার অনুভুত হল যেন এই খবরটি আমি আগে থেকেই জানি।
(৮)
প্রায় মাসছয়েক পরে প্রতীকের সাথে কথায় কথায় ও আমাকে জিজ্ঞেস করল- সত্যি করে
বলবি, তুই সেদিন কেন সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিলি?
-আমি তো সেদিনই তোদের বলেছি।
-আমার মনে হয় তুই কিছু লুকিয়েছিস। সবটা বলিসনি। আমি সেদিন তোকে কিছু জিজ্ঞেস
করিনি কারণ আমি উত্তর পাব না।
-আজ পাবি?
-পাব।
- কনফিডেন্ট?
-অনেকটা।
- কারণ?
- কারণ, তুই সেদিনের পর বদলে গেছিস।
- কিরকম?
-চেতনায়।
- মানে কি হল?
-মানে জানি না। আমরা এখন হাসির আড্ডায় না, বাস্তবতায়।
- হাসবিনা তো?
-না।
তবে শোন- আ ন এতু মনঃ পুনঃ ক্রত্বে দক্ষায় জিবসে। জ্যোক্ চ সূর্যং দৃশে। এই
সংস্কৃতের মানে জানিস?
-না।
সেই ভিখারি সেদিন আমায় বলেছিল। তার রহস্যময় দুটি স্থির চোখ আর এই কথা শুনে আমি
সংজ্ঞা হারিয়ে ছিলাম। যার বাংলা অর্থ- আমাদের মন সৎকর্ম সাধনে উৎসাহান্বিত হয়ে
অক্ষয় জীবন লাভের ও জ্ঞান সূর্য ভগবানকে দর্শনের আশায় আমাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত
হোক।
১৬ই জানুয়ারী, ২০১১, পীরেরবাগ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন